লেজেন্ডারি জুবিন দা: গান, মানবতা ও মানুষের আবেগের প্রতীক

Condolence for Zubeen Da at Hojai, Assam — thousands united in love and tears.

জুবিন গার্গ: অসমের হৃদয়ে চিরস্থায়ী এক সুর !


    যে মুহূর্তে হোজাইয়ের মাটিতে হাজারো মানুষের চোখে অশ্রু, হাতে প্রদীপ, মুখে জুবিন গার্গের গান—সেই দৃশ্যটি আমি কখনো ভুলব না জীবনও। এমন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগ—মানুষের অঙ্গনে এমন দৃশ্য আমার জীবনে আগে কখনো দেখিনি। জুবিন দা ছিলেন শুধু একজন গায়ক নন; তিনি ছিলেন অসমের আত্মা, ভারতের গর্ব, এবং আমাদের হৃদয়ের এক অমূল্য রত্ন। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম, একাধিকবার—প্রায় পাঁচটি ভক্ত সমাবেশ ও শ্রদ্ধাঞ্জলির মাধ্যমে আমার সমস্ত জীবনের প্রিয় শিল্পী, অভিনেতা ও সমাজকর্মীর প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছি।

অবদান ও সৃষ্টির মহিমা

জুবিন গার্গের সঙ্গীতজীবন ছিল অভাবনীয়। তিনি ৪০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন, এবং প্রতি বছর প্রায় ৮০০টিরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন। এক রাতে ৩৬টি গান রেকর্ড করার মতো অসাধারণ কীর্তি তাঁর জীবনে ছিল। তাঁর গানগুলিতে অসমীয়া, হিন্দি, বাংলা, নেপালি এবং অন্যান্য ভাষার বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। “যা আলি” গানটি তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়।

তাঁর সঙ্গীতের বৈচিত্র্য, গভীরতা ও আন্তরিকতা তাঁকে শুধুমাত্র অসমের নয়, ভারতের প্রতিটি প্রান্তে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তাঁর গান ছিল মানুষের দুঃখ, সুখ, প্রেম এবং সংগ্রামের প্রতিফলন। তিনি শিল্পীর পাশাপাশি একজন মানবিক নেতা ছিলেন। দরিদ্র ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর জীবনের অংশ ছিল। জুবিন দার জীবন দর্শন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারা তাঁকে একজন আদর্শ নাগরিক এবং যুবসমাজের জন্য এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।


হোজাইয়ের মাটিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

হোজাই জেলার মাঠে যখন জুবিন দার স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠিত হয়, তখন সেখানে উপস্থিত ছিল হাজার,  হাজারমানুষের ভিড়। প্রতিটি মুখে ছিল শোকের ছাপ, কিন্তু সেই শোকের মধ্যে লুকিয়ে ছিল গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। মানুষেরা তাঁর গান গেয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে, ফুল দিয়ে তাঁকে স্মরণ করছিল। আমি নিজের চোখে দেখেছি কিভাবে প্রতিটি ব্যক্তি আবেগ ও শ্রদ্ধার এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করেছিল।

এই দৃশ্য আমাকে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, জুবিন দা শুধু একজন গায়ক নন; তিনি মানুষের হৃদয়ের এক অমূল্য রত্ন। মানুষের অনুভূতি ও আবেগের সঙ্গে তাঁর আবেগের সংযোগ—এমন উদাহরণ আমি আমার জীবনে আগে কখনো দেখিনি। আমার নিজের অভিজ্ঞতা এবং হোজাইয়ের এই grassroots পর্যায়ের পর্যবেক্ষণই প্রমাণ করে যে, তিনি শুধুমাত্র একজন সেলিব্রিটি নন; তিনি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ছিলেন।

মানুষের ভালোবাসার অমলিন চিহ্ন

জুবিন দার মৃত্যু আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর গান আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। তাঁর সুরে আমরা আমাদের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, প্রেম-বিচ্ছেদ সবকিছু খুঁজে পেতাম। তাঁর গান ছিল আমাদের আত্মার প্রতিধ্বনি, জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার এক অনন্য শক্তি।

জুবিন দা ছিলেন কেবল একজন গায়ক নয়, তিনি একজন সমাজকর্মী, মানবিক নেতা ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অনন্য শক্তি ছিলেন। সমাজের প্রতি তাঁর অবদান, দরিদ্রদের পাশে থাকা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কাজ—সবকিছু মিলিয়ে তাঁকে অসম এবং ভারতের জন্য এক অসাধারণ দ্যুতি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

🕯️ চিরকাল বেঁচে থাকবেন

জুবিন দার মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর শোকের বিষয়। তবে তাঁর গান, সুর এবং স্মৃতি চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকবে। তিনি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। আমি বিশ্বাস করি, কিংবদন্তিরা কখনও মরে না; তাঁরা মানুষের হৃদয়ে, আবেগে এবং স্মৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকেন।

জুবিন দা, আপনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আপনার গান, আবেগ, মানবিকতা এবং প্রেরণা চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকবে। হোজাইয়ে মানুষের চোখে অশ্রু, প্রদীপে আলো, ফুলে শ্রদ্ধা—এগুলো সবই প্রমাণ যে আপনার নাম চিরকাল মানুষের হৃদয়ে অম্লান।

শেষ কথায় আমি বলতে চাই—legend never dies। তিনি আমার ও তাঁর ভক্তদের আবেগ, অনুভূতি এবং ভালোবাসার সঙ্গে চিরকাল যুক্ত থাকবেন।

Writter -আশীষ চক্রবর্ত্তী

Design a site like this with WordPress.com
Get started